কার্বন মনোক্সাইড (CO) একটি নীরব ঘাতক। গন্ধহীন ও বর্ণহীন এই গ্যাস প্রতি বছর যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৫০ হাজার মানুষকে জরুরি বিভাগে পাঠায় এবং প্রায় ১,৫০০ মানুষের মৃত্যু ঘটায়। এ গ্যাসের সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো এটি দ্রুত রক্তের হিমোগ্লোবিনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে অক্সিজেন পরিবহনকে বাধাগ্রস্ত করে। ফলাফল মস্তিষ্ক, হৃদপিণ্ডসহ গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোতে অক্সিজেনের অভাব, যা অনেক সময় মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এতদিন পর্যন্ত চিকিৎসা পদ্ধতি সীমাবদ্ধ ছিল মূলত ১০০% অক্সিজেন সরবরাহের মধ্যে, যা হাইপারবারিক চেম্বারে দেওয়া হয়। তবে এতে সময় লাগে এক ঘণ্টারও বেশি এবং অনেক ক্ষেত্রেই রোগীর মস্তিষ্ক বা হৃদপিণ্ডে স্থায়ী ক্ষতি থেকে যায়।
এই দীর্ঘদিনের সংকট সমাধানে এক যুগান্তকারী আবিষ্কার এনেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব মেরিল্যান্ড স্কুল অব মেডিসিন। গবেষকেরা তৈরি করেছেন প্রথম কার্যকর কার্বন মনোক্সাইড প্রতিষেধক, যা মিনিটের মধ্যেই রক্ত থেকে বিষাক্ত গ্যাসকে সরিয়ে দিতে সক্ষম।
প্রতিষেধকটির নাম RcoM-HBD-CCC। এটি একটি প্রকৌশলীকৃত প্রোটিন, যা মলিকুলার স্পঞ্জের মতো কাজ করে। সহজভাবে বলতে গেলে, এটি শরীরের ভেতরে প্রবেশ করার পর নির্বাচিতভাবে শুধু কার্বন মনোক্সাইড অণুগুলোর সঙ্গে যুক্ত হয়। আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, এটি অক্সিজেন বা নাইট্রিক অক্সাইডের মতো শরীরের অপরিহার্য যৌগগুলোর সঙ্গে কোনো হস্তক্ষেপ করে না।
মাউসের ওপর চালানো পরীক্ষায় দেখা গেছে, এই প্রোটিন রক্তে প্রবেশ করার পর মাত্র এক মিনিটেরও কম সময়ে অর্ধেক CO সরিয়ে ফেলতে সক্ষম হয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই প্রস্রাবের মাধ্যমে এটি সম্পূর্ণভাবে দেহ থেকে বেরিয়ে যায়। ফলস্বরূপ রক্ত আবার অক্সিজেন পরিবহনে সক্ষম হয়ে ওঠে এবং শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলো তাৎক্ষণিকভাবে অক্সিজেন পেতে শুরু করে।
বর্তমানে হাসপাতালে CO বিষক্রিয়ার চিকিৎসা দীর্ঘ ও জটিল। রোগীকে প্রায়শই হাইপারবারিক অক্সিজেন চেম্বারে রাখতে হয়, যেখানে চাপযুক্ত পরিবেশে বিশুদ্ধ অক্সিজেন শ্বাস নিতে হয়। তবে এতে যে সময়ক্ষেপণ হয়, সেটি অনেক ক্ষেত্রে মারাত্মক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। হৃদপিণ্ড ও মস্তিষ্কে স্থায়ী ক্ষতি থেকে যায় অনেক রোগীর।
নতুন প্রতিষেধকটি যদি মানবদেহেও একইভাবে কাজ করে, তবে এটি চিকিৎসা ব্যবস্থায় এক বিপ্লব আনবে। জরুরি সেবাদানকারী কর্মীরা (first responders) সরাসরি শিরায় (IV) এই প্রোটিন ইনজেকশন দিতে পারবেন। এর মাধ্যমে রোগীকে হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই রক্ত থেকে বিষাক্ত গ্যাস সরানো সম্ভব হবে, যা মৃত্যুহার নাটকীয়ভাবে কমাতে পারে।
গবেষণার ফলাফল ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত PNAS জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। এখন এটি আরও বিস্তৃত প্রাক-ক্লিনিক্যাল পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যাবে। যদি সবকিছু প্রত্যাশামতো সফল হয়, তবে শিগগিরই মানবদেহে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শুরু হতে পারে।
কার্বন মনোক্সাইড বিষক্রিয়া শুধু যুক্তরাষ্ট্রে নয়, বিশ্বব্যাপী একটি বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি। অনেক সময় ঘরে বা গ্যারেজে বন্ধ পরিবেশে হিটার, জেনারেটর, বা গ্যাস চালিত যন্ত্রপাতি ব্যবহারের সময় অজান্তেই মানুষ এ গ্যাসে আক্রান্ত হয়। বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশে, যেখানে বদ্ধ ঘরে চুলা বা জেনারেটরের ব্যবহার বেশি, সেখানে CO বিষক্রিয়ার ঝুঁকি আরও বড়।
তাই এই প্রতিষেধকের আবিষ্কার কেবল বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি নয়, বরং জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি সম্ভাব্য জীবনরক্ষাকারী সমাধান। যদি এটি কার্যকরভাবে বাজারে আসে, তবে আগামী দিনে হাজার হাজার মানুষের জীবন বাঁচাতে পারবে এই নতুন প্রোটিন-ভিত্তিক ওষুধ।


