কামনার প্রত্নতাত্ত্বিক পাঠ – খ্রিস্টপূর্ব সপ্তম শতকের নারীবাদ এবং কবি স্যাফো

প্রাচীন সভ্যতাগুলোর যৌনতা বিষয়ক বয়ান, আধুনিক পর্নোগ্রাফির তুলনায় অনেক বেশি সূক্ষ্ম, বুদ্ধিবৃত্তিক এবং শিল্পতাত্ত্বিক। এই সূক্ষ্মতার শিখরে দাঁড়িয়ে আছেন একজন নারী কবি—স্যাফো। খ্রিস্টপূর্ব সপ্তম শতাব্দীর লেসবস দ্বীপের এই কবির কবিতাগুলো দীর্ঘকাল ধরে পশ্চিমা জগতের অন্যতম রহস্যময় ইরোটিক সাহিত্য হিসেবে বিবেচিত। তাঁর কাজ একাধারে কামনা ও সৌন্দর্যের, ব্যক্তিগত যন্ত্রণার এবং প্রাচীন নারীবাদী কণ্ঠের নিদর্শন।

স্যাফোর কবিতায় যেভাবে কামনা প্রকাশ পায়, তা আধুনিক ভোগবাদী যৌনতার বিপরীতে এক ধরণের কাব্যিক প্রতিস্পর্ধা। তাঁর কবিতা ‘Fragment 31’—যেখানে তিনি বর্ণনা করেন প্রেমিকাকে দেখে শরীর কাঁপা, জিহ্বা বেঁধে যাওয়া, দৃষ্টিশক্তি ঝাপসা হয়ে আসা—সে একধরনের pathos বা গভীর শারীরিক-আত্মিক প্রতিক্রিয়া। ক্লাসিক্যাল স্কলার অ্যান কারসনের মতে, এটি “one of the earliest recorded descriptions of erotic shock in literature” (Carson, Eros the Bittersweet, 1986)। এই কবিতা পড়ে অনেকেই ধরে নেন, এটি নারীর প্রেমে নারীর আকুলতা—তবে এখানে কেবল যৌন আকর্ষণ নয়, বরং একধরনের অস্তিত্ববাদী টানাপড়েনও উপস্থিত। কামনা এখানে একটি নিঃশব্দ মৃত্যুপ্রক্রিয়া, শরীরের অন্তর্গত পতনের ছায়া। এবং এই মৃত্যুবোধই স্যাফোর কবিতায় ইরোটিকতাকে করে তোলে অতলস্পর্শী।

গ্রীক সমাজে কামনা ও সৌন্দর্য একটি নৈতিক ও দার্শনিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল। প্লেটো তাঁর সংলাপে ‘Phaedrus’ এবং ‘Symposium’-এ ইরোসকে বিভক্ত করেন দুইভাগে: common love এবং heavenly love। পরবর্তীটি ছিল প্লেটোনিক, দেহ অতিক্রম করে আত্মিক সংযুক্তির এক রূপ। কিন্তু স্যাফোর কবিতা প্লেটোর চিন্তার সাথে দ্বান্দ্বিক, কারণ তিনি কামনাকে আত্মিক হলেও গভীরভাবে শারীরিক বোধের সঙ্গে যুক্ত করেন। তাঁর কবিতায় প্রেমিক বা প্রেমিকা হয়ে ওঠে ঈশ্বরতুল্য, যেমন ‘অ্যানাক্টোরিয়া’-কে তিনি বলেন পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য। এখানে প্রিয়তমা কেবল দৃষ্টির বস্তু নয় বরং এক ধরণের মহাজাগতিক সৌন্দর্যের আধার।

স্যাফোর কবিতা একটি ব্যতিক্রমী জায়গায় দাঁড়ায় কারণ এগুলো সম্ভবত প্রথম ব্যক্তি নারীকণ্ঠে কামনার চিত্রায়ন। প্রাচীন বিশ্বে যেখানে অধিকাংশ সাহিত্য পুরুষের চোখে নারীর শরীর ও কামনার বয়ান রচনা করে, সেখানে স্যাফো উল্টো পথ ধরেন। এই কণ্ঠস্বর শুধু সাহসী নয় বরং গঠনমূলক—কারণ এটি কামনাকে ভাষা দেয়, একধরনের জ্ঞানতাত্ত্বিক কাঠামোতে রূপ দেয়। ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ মেরিলিন ইয়ালোম উল্লেখ করেন, “স্যাফোর কবিতা সম্ভবত নারী কামনার ইতিহাসে প্রথম সরাসরি আত্মপ্রকাশ, যা এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক স্বরাজ্যের সূচনা করে” (Yalom, A History of the Wife, 2001)।

আধুনিক পর্নোগ্রাফির সঙ্গে স্যাফোর কবিতাকে তুলনা করলে যে দ্বন্দ্বটি প্রকট হয়, তা হলো ‘representation vs. sensation’। পর্নোগ্রাফি দ্রুত চূড়ান্ততায় পৌঁছানোর একটি নির্দিষ্ট ভোগের উদ্দেশ্যে নির্মিত। সেখানে দেহ দৃশ্যায়নের উপায় পণ্যের মতো তুলে ধরা হয়। স্যাফোর কবিতায় দেহ নেই, আছে দেহের অবর্তমানতা—অর্থাৎ স্মৃতি, কল্পনা, আকাঙ্ক্ষা। কামনা এখানে এক অসম্পূর্ণতা, পূর্ণ হওয়ার আগেই কবিতার মধ্যেই বিলীন হয়। এটি ‘delay of gratification’ এর এক চূড়ান্ত শিল্পরূপ। ফরাসি মনোবিশ্লেষক লাকান বলেছিলেন, “desire is the desire of the Other”—স্যাফো যেন তার কবিতায় এই ‘অন্য’র জন্য অপেক্ষা করছেন; একজন ঈশ্বরের মতো প্রেয়সী, যার অস্তিত্ব বাস্তবের চাইতেও বেশি তীব্র।
প্রাচীন বিশ্বে নারী ইরোসের অন্যান্য রূপ

স্যাফোর মতো নারীকণ্ঠে ইরোটিকার উদাহরণ শুধু গ্রীসে নয়, খুঁজে পাওয়া যায় প্রাচীন মেসোপটেমিয়া, ভারত, আরব এবং আন্দালুসিয়ায়। এমনকি আন্দালুসিয়ান মুসলিম কবি ওয়ালাদা বিনতে মুস্তাকফির কবিতা—যেখানে তিনি লেখেন, “আমি ভালোবাসি তাকে, যে ভালোবাসা জানে”—এই সমস্ত বয়ানে যৌনতা হয় আত্মপ্রকাশের ভাষা, ভোগ নয়। স্যাফোর কবিতা আজ আমাদের কাছে আসে খণ্ড খণ্ড ফ্র্যাগমেন্ট হিসেবে। তিনি মোট ৯টি গ্রন্থ রচনা করেছিলেন বলে ধারণা করা হয়, সেগুলোর অধিকাংশই হারিয়ে গেছে। এই কবিতাগুলি মূলত সংরক্ষিত হয়েছে প্রাচীন প্যাপাইরাস, খণ্ডিত মৃৎপাত্রের ভাঙা টুকরো এবং মধ্যযুগীয় গ্রন্থকারদের উদ্ধৃতির মাধ্যমে।

স্যাফোর বিরুদ্ধে ইতিহাসে কীভাবে পুরুষতান্ত্রিক গোঁড়ামি কাজ করেছে, তা বোঝা যায় খ্রিস্টীয় মধ্যযুগের একাধিক দৃষ্টান্তে। চার্চ-নিয়ন্ত্রিত সমাজ ব্যবস্থায় নারী-কামনা ছিল ‘পাপ’ হিসেবে বিবেচিত। চতুর্থ শতকে খ্রিস্টীয় ধর্মতত্ত্ববিদ গ্রেগরি নাজিয়ানজেন সরাসরি স্যাফোর কবিতা ধ্বংস করার আহ্বান জানান। অনেক গবেষক বিশ্বাস করেন এর ফলে তার কবিতার বিরাট অংশ হারিয়ে যায়। স্যাফোর জন্মলগ্ন থেকেই তার নাম যুক্ত হয়ে যায় এক বিশেষ ভূখণ্ডের সাথে—লেসবস দ্বীপ, যা পরবর্তীকালে ‘লেসবিয়ান’ শব্দের উৎস হয়ে ওঠে। কিন্তু এই নামকরণের পেছনে রয়েছে ইতিহাস, যৌনতা ও ভাষার জটিল সম্পর্ক।

‘Lesbian’ শব্দটি ১৯শ শতকে ইউরোপে যৌনতার ভাষায় ব্যবহার শুরু হয়, যেখানে স্যাফোর নামই নারীর প্রতি নারীর প্রেমের সাংস্কৃতিক প্রতীক হয়ে ওঠে। তবে এই ব্যবহার সবসময় মুক্তচিন্তার প্রতিনিধিত্ব করেনি। অনেকসময় এটি ছিল ব্যঙ্গাত্মক, অপমানসূচক কিংবা চিকিৎসাবিজ্ঞানের মনোবিকৃতি চিহ্নিত করার জন্য ব্যবহৃত। তারপর আসে ‘heterosexual erasure’—এক ধরণের সাহিত্যিক পুনর্লিখন, যেখানে নারী-নারী প্রেমকে মুছে দিয়ে স্যাফোর কবিতাকে ‘নিরপেক্ষ’ রূপে উপস্থাপন করা হয়। নারীর কামনা ও কণ্ঠকে পিতৃতান্ত্রিক ইতিহাস ‘অস্থিতিশীল’ ও ‘অশ্লীল’ হিসেবে দমন করেছে, আর স্যাফো ছিলেন তার প্রধান শিকার।

স্যাফোর কবিতা আমাদের শেখায় যে কামনা কেবল শরীর নয় বরং ভাষার এক অন্তর্নিহিত কম্পন। তাঁর কবিতা একটি কাব্যযন্ত্র—যার মাধ্যমে আমরা ইরোসকে উপলব্ধি করি, কিন্তু কখনোই তাকে সম্পূর্ণ ধারণ করতে পারি না। এটি আমাদের মনে করায়, “desire” শব্দটির উৎপত্তি ‘de-siderare’—অর্থাৎ বিচ্ছিন্ন হওয়া থেকে। একটি অসম্পূর্ণ, কিন্তু অতল জার্নি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন