এশিয়ার ইন্টারনেট কার ? চীনের না আমেরিকার !

SeaMeWe-6 সাবমেরিন কেবল প্রকল্প, যা এশিয়া থেকে ইউরোপে ইন্টারনেট সংযোগ স্থাপন করবে, যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের মধ্যকার প্রযুক্তি প্রতিযোগিতার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সম্পর্ক পার্টির সেই দুজন অতিথির মতো যারা একে অপরকে সহ্য করতে পারে না, আবার এড়িয়েও চলতে পারে না। যুক্তরাষ্ট্র অনেকদিন ধরেই পরাশক্তি, সে তুলনায় চীনের উত্থান হয়েছে পরে। যুক্তরাষ্ট্র চীনকে নিজের বিশ্বব্যাপী আধিপত্যের জন্য হুমকি মনে করে। তাদের জিওপলিটিক্যাল দ্বন্দ্ব এখন বাণিজ্য, সামরিক স্ট্রাটেজি, অর্থনীতিকে ছাড়িয়ে পৌঁছে গেছে সমুদ্রের তলা দিয়ে যাওয়া আন্তঃমহাদেশীয় ইন্টারনেট কেবল নেটওয়ার্কের রাজ্যে। সাম্প্রতিক সময়ে সাউথ ইস্ট এশিয়া-মিডল ইস্ট-ওয়েস্টার্ন ইউরোপ ৬ (SeaMeWe-6) সাবমেরিন কেবল প্রকল্প, যা এশিয়া থেকে ইউরোপে ইন্টারনেট সংযোগ স্থাপন করবে, যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের মধ্যকার প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে।

প্রকল্পের মূল চুক্তি প্রথমে ৫০০ মিলিয়ন ডলারের প্রস্তাবে চীনা প্রতিষ্ঠান HMN Technologies-এর হাতে যাওয়ার কথা ছিল ও চীন সরকারের পক্ষ থেকে ভর্তুকি পাওয়ার কারণে তারা তুলনামূলক- ভাবে সস্তায় এই প্রস্তাব দিতে সক্ষম হয়েছিল। সিঙ্গাপুর থেকে ফ্রান্স পর্যন্ত সাবমেরিন কেবল প্রকল্পটি চীনের HMN Technologies-এর সবচেয়ে বড় প্রকল্প হতে পারত, যা প্রতিষ্ঠানটিকে বিশ্বের দ্রুততম সাবমেরিন কেবল নির্মাতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করত এবং চীনের তিনটি প্রধান টেলিকম কোম্পানির বৈশ্বিক প্রভাব বৃদ্ধি করত। তবে, যুক্তরাষ্ট্র সরকার চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর গুপ্তচরবৃত্তির আশঙ্কার ভয় দেখিয়ে কনসোর্টিয়াম সদস্যদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে এবং সফলভাবে এই চুক্তিটি মার্কিন কোম্পানি SubCom-কে পাইয়ে দেয়।

এরকম ঘটনা শুধু একটা নয়, গত চার বছরে মার্কিন সরকার এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে চীনা কোম্পানির অন্তত ছয়টি সাবমেরিন কেবল চুক্তি ভেস্তে দিতে সফল হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের মধ্যে এশিয়ার সাবমেরিন কেবল নেটওয়ার্ক নিয়ে বিরোধ মূলত প্রযুক্তিগত এবং ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার ফলাফল, যা বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার ওপর গভীর প্রভাব ফেলছে। সাবমেরিন কেবলগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো, যা বিশ্বের ৯৫ শতাংশের বেশি তথ্য পরিবহন করে, যার মধ্যে আর্থিক লেনদেন, যোগাযোগ এবং সামরিক তথ্য অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্ররা এই খাতে আধিপত্য বজায় রেখেছে, কিন্তু চীন এখন ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে নিজস্ব কেবল নেটওয়ার্ক তৈরি করে সেই আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করছে।

বিরোধের মূল কারণহলো যুক্তরাষ্ট্র উদ্বিগ্ন যে, চীন তার নিয়ন্ত্রণাধীন কেবলগুলো ব্যবহার করে গুপ্তচরবৃত্তি, নাশকতা বা অন্যান্য সাইবার কার্যক্রম চালাতে পারে। সাবমেরিন কেবলগুলো বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য অপরিহার্য। এগুলোর নিয়ন্ত্রণে থাকা, দেশ বৈশ্বিক তথ্যপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে, যা অর্থনৈতিক প্রভাব বাড়িয়ে তুলবে। এই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র চীনা কোম্পানিগুলোর সাবমেরিন কেবল চুক্তি অর্জনে বাধা দিতে মিত্রদের চাপ দিচ্ছে এবং বেসরকারি কনসোর্টিয়ামগুলিকে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাদ দেওয়ার জন্য লবিং করছে। যুক্তরাষ্ট্র বিশেষভাবে সাবমেরিন কেবল প্রকল্পে হস্তক্ষেপ করেছে যাতে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো যুক্তরাষ্ট্রের অঞ্চল বা কৌশলগত অঞ্চলের সাথে সরাসরি সংযোগ স্থাপন করতে না পারে।

এই প্রচেষ্টা চীনের প্রযুক্তিগত আধিপত্য রোধ এবং বৈশ্বিক যোগাযোগ অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার একটি অংশ। সাবমেরিন কেবলের উপর নিয়ন্ত্রণ শুধুমাত্র জাতীয় নিরাপত্তার বিষয় নয়, বরং অর্থনৈতিক আধিপত্যেরও ব্যাপার। এ অবকাঠামোর নিয়ন্ত্রণ যে ধরে রাখবে, সে বৈশ্বিক তথ্য প্রবাহে বিঘ্ন ঘটানোর বা নজরদারি করার ক্ষমতা পাবে, যা অর্থনৈতিক এবং সামরিক ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা দেবে। এজন্য যুক্তরাষ্ট্র চীনের প্রভাবকে সীমিত করাকে তাদের বৈশ্বিক নেতৃত্ব বজায় রাখার জন্য গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের শত বাধার মুখেও চীন থেমে থাকতে রাজি নয় ও জাপান-ভিত্তিক Nikkei Asia সংবাদ সংস্থার একটি প্রবন্ধ অনুযায়ী, চীন বৈশ্বিক সাবমেরিন কেবল নেটওয়ার্ক থেকে তাদেরকে বিচ্ছিন্ন করার যুক্তরাষ্ট্রের চেষ্টাকে পাত্তা দিচ্ছে না।

চীন আঞ্চলিক প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে চুক্তি করছে এবং নিজস্ব কেবল নেটওয়ার্ক তৈরি করছে, কারণ যুক্তরাষ্ট্র তার রাজনৈতিক ক্ষমতা ব্যবহার করে বেশিরভাগ মার্কিন ভিত্তিক ডেটা কোম্পানি- গুলোর ওপর চাপ প্রয়োগ করছে যাতে ভবিষ্যতের কেবলগুলোতে চীনকে প্রবেশ করতে না দেয়া হয়। Nikkei Asia-কে এক চীনা নির্বাহী তাদের বলেছেন যে যুক্তরাষ্ট্র চীনকে কালো তালিকাভুক্ত করবে এটা নিয়ে তারা চিন্তিত নন এবং তিনি দাবি করেন যে বৈশ্বিক সাবমেরিন কেবল নেটওয়ার্ক প্রজেক্টগুলো থেকে চীনকে দূরে রাখার চেষ্টা করাটা যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য বজায় রাখার একটি মাধ্যম। তিনি বলেন যে এই প্রতিযোগিতা আসলে কূটনৈতিক, যেখানে চীনের কেবল নেটওয়ার্কের সাথে যুক্ত হওয়ার জন্য চীনের শুধুমাত্র দরকার অন্যান্য সরকারের অনুমতির ।

অন্তত তিনটি বড় চীন-নেতৃত্বাধীন প্রকল্প বর্তমানে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে নির্মাণাধীন, যা চীন ও হংকংকে ফিলিপাইন, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া এবং সিঙ্গাপুরের মতো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সাথে সংযুক্ত করছে। সমুদ্রের তলদেশ দিয়ে ইন্টারনেট কেবল বসানোতে চীন খুবই সক্ষম ও চীনের কাছে ইতিমধ্যেই প্রয়োজনীয় ফাইবার অপটিক প্রযুক্তি রয়েছে। এই কারণে যুক্তরাষ্ট্র বৈশ্বিক সাবমেরিন কেবল নেটওয়ার্ককে চীনের দ্বারা নাশকতা এবং আড়ি-পাতার ঝুঁকিতে দেখছে। যুক্তরাষ্ট্র চীনের এই বিরোধ ইন্দোপ্যাসিফিক অঞ্চলে ভূরাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা তৈরি করছে, কারণ অঞ্চলটির দেশগুলোকে কেবল প্রযুক্তিগত বিষয়ে পক্ষ নিতে বাধ্য করা হচ্ছে যা এই অঞ্চলের উত্তেজনা বাড়ানোর সম্ভাবনা তৈরি করছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন