… শেখ হাসিনার ১৬ বছরের শাসনামলে আমি তাঁর সঙ্গে দেখা করিনি, কথা বলিনি। …তাদের প্রতি আমার কোনো বিরাগ নেই, কিন্তু আমি একটা অবস্থানে অনড় ছিলাম যে তারা গণতন্ত্রের পথে না আসা পর্যন্ত আমি দেখা করব না। … সেটা আওয়ামী লীগের শাসন ছিল নাকি হাসিনা লীগের মাফিয়া স্টাইলের শাসন ছিল? প্রকৃতপক্ষে সেটা একটা পরিবার লীগের শাসন ছিল। কারণ, আওয়ামী লীগের কথা আমি যখন চিন্তা করি, তখন মাওলানা ভাসানীর কথা চিন্তা হয়, শামসুল হকের কথা চিন্তা হয়। আমার বাবা তাজউদ্দীনের কথা মনে হয়। এমনকি একাত্তর-পূর্ববর্তী বঙ্গবন্ধুর কথাও চিন্তা হয়। তাঁরা গণমানুষের প্রতিনিধি ছিলেন। কিন্তু আওয়ামী লীগ হাইজ্যাক হয়ে যায় একটা পরিবারের কাছে। একটা পরিবারতন্ত্র হয়ে উঠেছিল, তাঁরা আওয়ামী লীগের ব্যানারটা ব্যবহার করেছিলেন।
সে জন্য আমার কাছে মনে হয়, আওয়ামী লীগের মধ্যে যেসব নেতা-কর্মীর বিবেক এখনো জাগ্রত আছে, তাঁরা যদি সবাই প্রতিবাদী হয়ে হাসিনা লীগের সঙ্গে আওয়ামী লীগের একটা সুস্পষ্ট পার্থক্যরেখা টানতে পারেন, তাহলেই আওয়ামী লীগের একটা রাজনৈতিক সম্ভাবনা থাকবে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এত এত দুর্নীতি হয়েছে, আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের থেকেই এর বিরুদ্ধে ডাকটা আসা উচিত। তাঁরা যদি বুদ্ধিমান হন, যদি সত্যিই আওয়ামী লীগকে ভালোবাসেন, তাহলে তাঁদের বলতে হবে যে তাঁদের দলে কোনো ক্রিমিনাল থাকবে না। শেখ হাসিনা ও তাঁর আশপাশে যাঁরা ছিলেন, তাঁরা সবাই ক্রিমিনাল। তাঁদের বিচারের আওতায় আনতে হবে। এই দাবিকে বাইরের লোক শুধু কেন করবে? বিচারের দাবি কেন আওয়ামী লীগের ভেতর থেকে আসবে না? … অবশ্যই তাদের ক্ষমা চাইতে হবে। কোনো রাজনৈতিক কারণে নয়, অনুশোচনাটা সত্যিকারের মন থেকে আসতে হবে। মানুষ যখন দেখবে আচরণে, চিন্তায়, কথাবার্তায় পরিবর্তন এসেছে, তাহলে ধীরে ধীরে তাদের নিয়ে মানুষের মধ্যে আস্থাটা ফিরতে শুরু করবে।
… আওয়ামী লীগের উচ্চ মহল, শেখ হাসিনার আত্মীয়স্বজনদের কাছ থেকে আমি, সোহেল, আমাদের কাছে ফোনকল এসেছে। তাঁরা জানতে চেয়েছেন, আওয়ামী লীগের হালটা ধরব কি না। আমি তাঁদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছি, ‘৭৫ পরবর্তী সময়ে জোহরা তাজউদ্দীন আওয়ামী লীগের হাল ধরেছিলেন। তখন কিন্তু আওয়ামী লীগের অবস্থা এখানকার চেয়ে অনেক ভালো ছিল। আমার মা যখন আওয়ামী লীগের হাল ধরেছিলেন, তখন আওয়ামী লীগের প্রায় সবাই তৃণমূলের রাজনীতি থেকে উঠে আসা মানুষ। … আম্মা যখন আওয়ামী লীগকে গণতন্ত্রের পথে নিয়ে আসতে শুরু করলেন, দলকে একটা শক্ত জায়গায় নিয়ে এলেন তখন কী হলো? আব্দুর রাজ্জাক সাহেবরা দিল্লি থেকে শেখ হাসিনাকে নিয়ে এলেন। এরপর আওয়ামী লীগ আর দলের থাকল না। পরিবারের হয়ে গেল।
আমি ব্যক্তিগতভাবে রাজনীতিতে পরিবারতন্ত্র পছন্দ করি না। কেউ যদি নতুন আসে, আমরা তাদের জন্য কাজ করব, তাদের গাইড করব। কিন্তু তাজউদ্দীনের সন্তান হিসেবে আমরা রাজনীতিতে আসতে চাইব না। যাঁরা ফোনকল করেছেন, আমি তাদের বলেছি, আপনারা আবার তাজউদ্দীনের পরিবারের কাছে আসছেন! আপনারা নিজেরা দলকে ধ্বংস করে এখন চাচ্ছেন আবার আমরা আসব, দলকে গড়ে দেব। এরপর আপনারা ফিরে এসে সেটার ফল নেবেন?
এবার আমরা এই অবস্থান নিয়েছি যে আওয়ামী লীগের ভেতর থেকে অনুশোচনা আসুক, আত্মোপলব্ধি আসুক। জনগণের কাছে তাদের ক্ষমা চাইতে হবে। প্রত্যেক আহত ব্যক্তির কাছে, প্রত্যেক নিহত ব্যক্তির পরিবারের কাছে গিয়ে পা ধরে মাফ চাইতে হবে। যে টাকা বিদেশে পাচার করে নিয়েছেন, সেটা জনগণের কাছে ফিরিয়ে দিতে হবে। প্রথম আলোর সাথে সাক্ষাৎকারে শারমিন আহমদ : লেখক-গবেষক ও বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের কন্যা।


