উর্বরতার দেবীর সাথে কিভাবে জড়িয়ে গেলো খরগোশ !

প্রতি বসন্তে খ্রিস্টান বিশ্ব যখন ইস্টারের খ্রিস্টীয় আনন্দোৎসব পালন করে, তখন শিশুদের চোখেমুখে দেখা যায় রঙিন ডিম আর খরগোশরূপী ইস্টার বানির মৃদু হাসি। আধুনিক দৃষ্টিতে নিরীহ ও শিশুসুলভ এই “ইস্টার বানি” কালচার আদতে কতটা নিরীহ? এ কি কেবলমাত্র আনন্দের প্রতীক? নাকি এর গভীরে লুকিয়ে আছে প্রাচীন প্যাগান ধর্মবিশ্বাস, উর্বরতা উপাসনা, মধ্যযুগীয় লোককথা এবং আধুনিক কল্পনার এক জটিল ছায়া? ইস্টার বানির প্রাচীনতম সূত্রপাত খুঁজতে হলে আমাদের ফিরতে হবে প্রাচীন ইউরোপীয় প্যাগান ধর্ম ও বিশেষ করে জার্মানিক ও অ্যাংলো-স্যাকসন পুরাণের দিকে। এখানে আমরা পাই এক রহস্যময় দেবী ‘Ēostre‘ কে। এই দেবী বসন্তের উর্বরতা, নবজন্ম ও সূর্যের শক্তির প্রতীক ছিলেন। সপ্তম শতকের ইংল্যান্ড ও জার্মানির জনগণ তাঁর আরাধনা করতো।

Easter -এর উৎপত্তিও Ēostre-এর নাম থেকে বলে বহু ঐতিহাসিক মত দেন। বিখ্যাত ইংরেজ ধর্মতাত্ত্বিক বিডি ‘Venerable Bede’ তাঁর De temporum ratione গ্রন্থে Ēostre পূজার উল্লেখ করেন। Ēostre-এর প্রতীক ছিল খরগোশ ও ডিম। কেন? কারণ খরগোশ দ্রুত বংশবৃদ্ধি ও প্রজননের ক্ষমতার জন্য উর্বরতার প্রতীক। একইভাবে ডিম প্রাচীনকাল থেকে জীবন ও পুনর্জন্মের প্রতীক। বসন্তে জমি উর্বর, প্রকৃতিতে প্রাণ ফিরে আসে। এই দৃষ্টিকোণ থেকেই Ēostre-এর উর্বরতা পূজায় খরগোশ ও ডিমের গুরুত্ব ছিল। ১১শ শতকে খ্রিস্টধর্ম ইউরোপজুড়ে প্রবল হয়ে ওঠার পর বহু প্যাগান রীতিনীতি খ্রিস্টীয় আচার-অনুষ্ঠানের সাথে মিশে যায়। Ēostre পূজার বহু আচার-অনুষ্ঠান, প্রতীক ও লোককাহিনি খ্রিস্টীয় ইস্টার উৎসবে স্থান পায়। গবেষকরা বলেন, খ্রিস্টানরা নিজেদের ধর্মীয় উৎসবের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে এইসব পূর্ব-প্রচলিত প্রতীক ও লোকজ রীতিকে ধর্মীয়করণ করে নেয়।

বিশেষত খ্রিস্টীয় ইস্টার যিশুর পুনরুত্থান উদযাপন করে, যেখানে পুনর্জন্ম, জীবনের বিজয় ও নবচেতনা বিষয়গুলো প্যাগান Ēostre পূজার থিমের সাথে সাযুজ্যপূর্ণ ছিল। ১৩শ থেকে ১৬শ শতকের মধ্যযুগীয় ইউরোপীয় লোককাহিনিতে আমরা “Spring Hare” বা “Easter Hare” চরিত্রের ইঙ্গিত দেখতে পাই। বলা হয় Ēostre একবার একটি পাখিকে খরগোশে রূপান্তরিত করেছিলেন। সেই খরগোশ পাখির স্বভাব হারায়নি, সে আজও ডিম পাড়ে! এই অদ্ভুত কল্পকাহিনি থেকেই ডিম পাড়া খরগোশ বা ইস্টার বানি এর ধারণার সূচনা।১৬৮০ সালে জার্মানির লোকগাঁথা গ্রন্থ De ovis paschalibus -এ প্রথম ইস্টার বানি-এর লিখিত উল্লেখ পাওয়া যায়। গল্প অনুসারে ইস্টার বানি বসন্ত উৎসবে ভালো শিশুদের জন্য রঙিন ডিম লুকিয়ে রাখে। তখন থেকেই এই চরিত্রটি ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হয়।

১৮শ শতকে জার্মান অভিবাসীরা ইস্টার বানি-এর ঐতিহ্য নিয়ে আমেরিকায় প্রবেশ করে। পেনসিলভানিয়ার জার্মান সম্প্রদায় প্রথম এই প্রথা চালু করে, যেখানে শিশুরা ইস্টারের রাতে “Osterhase” (ডিম পাড়া খরগোশ)-এর জন্য টুকরো খড় দিয়ে বাসা বানাতো। খরগোশটি সেখানে ডিম রেখে যেত। ধীরে ধীরে এই ডিমের সাথে চকোলেট, খেলনা ইত্যাদিও যুক্ত হয়। ১৯শ শতকের শেষ দিকে এবং ২০শ শতকে বানিজ্যিকীকরণের ফলে ইস্টার বানির চরিত্র আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। আমরা যদি গভীর দৃষ্টিতে দেখি, ইস্টার বানি কোনো একক ধর্মীয় চরিত্র নয়, উর্বরতা, পুনর্জন্ম ও সময়চক্রের এক সাংস্কৃতিক প্রতীক। খ্রিস্টান ইস্টার যিশুর পুনরুত্থানকে স্মরণ করে, এটি জীবন-মৃত্যু-জীবনের প্রতিচক্র। কিন্তু এর সাথে জড়ানো রয়েছে প্যাগানদের প্রকৃতির পুনর্জাগরণ ও উর্বরতার চেতনা।

তাছাড়া খরগোশের প্রতীকি মূল্য এতটাই শক্তিশালী ছিল যে, মধ্যযুগীয় খ্রিস্টীয় শিল্পকলায়ও Virgin Mary-এর সাথে পবিত্রতার প্রতীকরূপে হেয়ার’কে চিত্রিত হয়েছে। বিখ্যাত ব্রিটিশ নৃতাত্ত্বিক জেমস ফ্রেজার তাঁর বই The Golden Bough-এ বলেন, “প্রতিটি বসন্ত উৎসবে আমরা মানবজাতির গভীর অন্তর্নিহিত প্রজনন ও নবজীবনের আকাঙ্ক্ষাকে উপলব্ধি করি। ইস্টার বানি সেই আকাঙ্ক্ষারই এক চিত্ররূপ।” ইস্টার বানির প্রতীকী ধারণা শুধু ইউরোপ-আমেরিকাতেই নয়, বহু পুরাতন সভ্যতায় খরগোশ ও ডিমের গুরুত্ব ছিল।

– মিসরীয় পুরাণ: খরগোশ চাঁদের প্রতীক।
– চীনা পুরাণ: চাঁদের মধ্যে “Jade Rabbit” (যা অমরত্বের ওষুধ প্রস্তুত করে)।
– ভারতের চন্দ্রকথা: খরগোশের বলিদানের গল্প (যেটি চাঁদে স্থান পায়)।
– মায়ান সভ্যতা: চাঁদ ও উর্বরতার সাথে খরগোশের সংযোগ দেখা যায়।

আজকের দিনে ইস্টার বানির উপস্থিতি যেন শুধুই বাণিজ্যিক ও শিশুসুলভ বিনোদন— চকোলেট ডিম, কার্টুন বানি, বসন্ত উৎসব। কিন্তু এই বহিরাঙ্গিক খোলসের নিচে ইতিহাস, পুরাণ ও প্রতীকের এক গভীরতর স্তর রয়েছে।

ইস্টার বানির চরিত্র আমাদের মনে করিয়ে দেয় সংস্কৃতি কখনো একরৈখিক নয়। বরং প্রাচীন দেবী Ēostre-এর উর্বরতা পূজা, মধ্যযুগীয় লোকগাঁথা, খ্রিস্টীয় পুনর্জন্মের বার্তা ও আধুনিক কল্পনা সব মিলে এক অদ্ভুত, অন্য এক প্রতীক নির্মাণ করেছে। ইস্টার বানির চোখের পেছনে যেন লুকিয়ে আছে কয়েক হাজার বছরের মানবসমাজের সাংস্কৃতিক চেতনার ছায়া। যখন কোনো শিশু উচ্ছস্বিত চোখে ইস্টার ডিম খোঁজে আমরা যেন ভুলে না যাই, সে কেবল ডিম নয়, বরং হাজার বছরের পুরনো এক পৌরাণিক চেতনা ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারকেও স্পর্শ করছে!

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন