দক্ষিণ এশিয়ার শান্তিপূর্ণ দ্বীপদেশ শ্রীলঙ্কা, যার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও বৌদ্ধ ঐতিহ্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত, সেই রাষ্ট্রে এক সময় বাস্তবতা ছিল পুড়ে যাওয়া গ্রাম, আত্মঘাতী হামলা, মাইন বিস্ফোরণ ও সংঘর্ষে পরিপূর্ণ একটি সমাজ। ১৯৮৩ সাল থেকে শুরু হয়ে ২০০৯ সাল পর্যন্ত স্থায়ী হয় এক দীর্ঘ, রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ। এই যুদ্ধ ছিল জাতিগত বৈষম্য, সাংস্কৃতিক বঞ্চনা ও আত্মপরিচয়ের সংগ্রাম থেকে উদ্ভূত, যা ক্রমে এক অস্ত্রধারী সংঘর্ষে রূপ নেয়।
শ্রীলঙ্কা ১৮১৫ সালে ব্রিটিশ শাসনের অধীনে আসে। ব্রিটিশ শাসকেরা প্রশাসনিক ও শিক্ষাব্যবস্থায় তুলনামূলকভাবে তামিলদের অগ্রাধিকার দিয়েছিল, কারণ তামিল জনগোষ্ঠী শিক্ষিত ছিল এবং দক্ষিণ ভারতের তামিল অভিবাসীরা চা বাগানেও কাজ করত। কিন্তু ১৯৪৮ সালে স্বাধীনতার পর সংখ্যাগরিষ্ঠ সিংহলি গোষ্ঠী রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয় এবং একে একে এমন সব আইন প্রণয়ন শুরু করে যা তামিলদের প্রতি বৈষম্যমূলক ছিল।
১৯৫৬ সালে পাশ হওয়া “Sinhala Only Act” ছিল অন্যতম বিতর্কিত পদক্ষেপ, যা সিংহলি ভাষাকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা ঘোষণা করে। এর মাধ্যমে তামিলদের প্রশাসনিক ও শিক্ষাগত সুযোগ সংকুচিত হয়ে পড়ে। সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থা চালু হয়, যেখানে সিংহলিদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। এই বৈষম্যমূলক নীতির বিরুদ্ধে তামিলদের মধ্যে বিরোধ বাড়তে থাকে এবং তাদের মধ্যে এক ধরনের আত্মনিয়ন্ত্রণের দাবি জন্ম নেয়।
এই সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক বঞ্চনার প্রতিক্রিয়ায় ১৯৭৬ সালে গঠিত হয় Liberation Tigers of Tamil Eelam (LTTE), যাকে তামিল টাইগাররাও বলা হয়। এর প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন ভেলুপিল্লাই প্রভাকরণ। এলটিটিই’র লক্ষ্য ছিল শ্রীলঙ্কার উত্তর-পূর্বাঞ্চলে একটি স্বাধীন তামিল রাষ্ট্র ‘তামিল ইলাম’ গঠন করা। তাদের কৌশল ছিল চরমপন্থী রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড, আত্মঘাতী বোমা হামলা এবং শিশু সৈনিক ব্যবহারের মতো নৃশংস পন্থা অবলম্বন করে তারা নিজেদের সামরিক শক্তি বাড়িয়ে তোলে।
এই সংঘর্ষ ক্রমেই পূর্ণাঙ্গ গৃহযুদ্ধে রূপ নেয়। এলটিটিই কেবল একটি বিদ্রোহী সংগঠন ছিল না, তারা সমান্তরাল প্রশাসন, আদালত এবং কর আদায় ব্যবস্থাও চালু করেছিল। তারা বহু আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্বকে হত্যা করে যার মধ্যে ভারতের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী এবং শ্রীলঙ্কার রাষ্ট্রপতি প্রেমাদাসাও ছিলেন।
যুদ্ধের ধাপসমূহ ও ভারতের ভূমিকা
গৃহযুদ্ধকে সাধারণত চারটি ধাপে ভাগ করা যায়। প্রথম পর্যায়ে, ১৯৮৩ সালে সংঘটিত “Black July” দাঙ্গায় সিংহলি জনতা বহু তামিলকে হত্যা করে, যা যুদ্ধের সূচনা চিহ্নিত করে। এরপর ভারতের হস্তক্ষেপ শুরু হয়। ১৯৮৭ সালে ইন্দো-শ্রীলঙ্কা চুক্তির মাধ্যমে ভারতীয় শান্তিরক্ষী বাহিনী শ্রীলঙ্কায় প্রবেশ করে। তবে এলটিটিই-র সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ শুরু হলে ভারতীয় বাহিনী বিতর্কিত হয়ে পড়ে এবং অবশেষে ১৯৯০ সালে তারা প্রত্যাহার করে।
দ্বিতীয় ও তৃতীয় পর্যায়ে যুদ্ধ আরও বিস্তৃত হয়। এলটিটিই বহু এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়। সরকার ও বিদ্রোহীদের মধ্যে একাধিকবার যুদ্ধবিরতি হলেও তা ভেঙে পড়ে। ২০০৬ সালে মাহিন্দা রাজাপাকসে প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর সরকার যুদ্ধজয়ের কৌশলে যায়। ২০০৯ সালের মে মাসে প্রভাকরণ নিহত হন এবং এলটিটিই সম্পূর্ণভাবে পরাজিত হয়।
এই যুদ্ধ শুধু সামরিক সংঘর্ষ ছিল না ছিল এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়। অনুমান করা হয় যে, কেবল ২০০৯ সালের জানুয়ারি থেকে মে মাসের মধ্যে প্রায় ৪০,০০০ বেসামরিক নাগরিক প্রাণ হারান। প্রায় ৩ লক্ষ তামিল উদ্বাস্তুতে পরিণত হন, লক্ষাধিক শিশু শিক্ষার বাইরে পড়ে যায় এবং বহু এলাকায় ধর্ষণ ও নির্যাতনের ঘটনা ঘটে।
যুদ্ধের শেষ ধাপে জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো মানবতাবিরোধী অপরাধ ও যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ তোলে। সরকার তা অস্বীকার করলেও আন্তর্জাতিক মহলে শ্রীলঙ্কার ভাবমূর্তি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
যুদ্ধ শেষ হলেও সমস্যার সমাধান হয়নি। সরকার কিছু অবকাঠামো উন্নয়ন এবং পুনর্বাসন প্রকল্প গ্রহণ করে, তবে তামিল জনগণের অভিযোগ ছিল সেনাবাহিনী তাদের ভূমি দখল করে রেখেছে, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বে তারা এখনও পিছিয়ে এবং বৌদ্ধ প্রতীক দিয়ে তামিল সাংস্কৃতিক স্থানগুলোকে সংকুচিত করা হয়েছে।
একদিকে শান্তি প্রতিষ্ঠার দাবি, অন্যদিকে নিপীড়নের বাস্তবতা এই দ্বৈততা শ্রীলঙ্কার রাজনীতি ও সমাজে এখনও প্রতিফলিত হচ্ছে। যুদ্ধজয়ের পরও যদি জাতিগত সহাবস্থান ও মর্যাদার ন্যায্য বণ্টন না হয়, তবে তা শুধু একটি অস্ত্রবিহীন যুদ্ধের সূচনা মাত্র।
শ্রীলঙ্কার গৃহযুদ্ধ আমাদের শিখিয়ে দেয়, একটি রাষ্ট্রে যদি সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্রেণি নিজেদের আধিপত্যকে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করে এবং সংখ্যালঘুদের বঞ্চিত করে, তবে সেই সমাজে সহিংসতা অনিবার্য হয়ে ওঠে। এই যুদ্ধ শুধু শ্রীলঙ্কার অভ্যন্তরীণ সমস্যা ছিল না, ছিল গোটা দক্ষিণ এশিয়ার জন্য এক সতর্কবার্তা জাতিসত্তার স্বীকৃতি, অধিকার ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণ যদি অবহেলিত হয় তবে একটি রাষ্ট্রের ভেতরেই গৃহযুদ্ধ জন্ম নেয়।


