ইরান বর্তমানে এক ভয়াবহ পানি সংকটের মুখোমুখি। জলবায়ু পরিবর্তন, দীর্ঘস্থায়ী খরা, অব্যবস্থাপনা এবং আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে দেশটি বহুমুখী পরিবেশগত বিপর্যয়ের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে। এই সংকট শুধু তেহরানের মতো বড় শহরগুলোতেই নয়, বরং দেশটির কৃষি ও প্রাকৃতিক বাস্তুসংস্থানেও মারাত্মক প্রভাব ফেলছে।
ইরানের জলসংকটের মূল কারণগুলো হলো ইরান পৃথিবীর “শুষ্ক বলয়”-এর অন্তর্ভুক্ত। গত পাঁচ বছর ধরে দেশটি লাগাতার খরার শিকার। দেশটির ভাইস-প্রেসিডেন্ট ও পরিবেশ সুরক্ষা সংস্থার প্রধান শিনা আনসারি জানান, গত তিন দশকে ইরানের তাপমাত্রা ১.৮° সেলসিয়াস বৃদ্ধি পেয়েছে এবং গত পাঁচ বছরে বৃষ্টিপাত প্রায় ৩০% কমে গেছে। তেহরানে গত বছর বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ছিল মাত্র ১৫৮ মিমি, যা দীর্ঘমেয়াদি গড় বৃষ্টিপাতের চেয়ে ৪২% কম।
কৃষিক্ষেত্রে জলের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার এই সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ। দেশটির প্রায় ৮৮% জল কৃষি খাতে ব্যবহৃত হয়, যেখানে জিডিপিতে এই খাতের অবদান মাত্র ১০-১২%। এছাড়াও হাজার হাজার অননুমোদিত কূপ থেকে জল উত্তোলন করা হয়। শুধুমাত্র আলবোর্জ পর্বতমালার উত্তরেই ৮,০০০-এর বেশি অননুমোদিত কূপের সন্ধান পাওয়া গেছে।
অতীতে ভুল পরিকল্পনায় জল-নির্ভর শিল্পকারখানাগুলো শুষ্ক এলাকায় স্থাপন করা হয়েছে এবং অপরিকল্পিতভাবে বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। শিনা আনসারি স্বীকার করেন, ১৯৯৪ সালের আগে পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন ছাড়াই অনেক বাঁধ নির্মিত হয়েছে, যা দেশের বাস্তুসংস্থানকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
ইরানের জল ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা খুবই খণ্ডিত। জল ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, যেমন—শক্তি মন্ত্রণালয়, কৃষি জিহাদ মন্ত্রণালয় এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মধ্যে বিভক্ত, কিন্তু তাদের মধ্যে কোনো সমন্বয় নেই।
এই জলসংকটের ফলে ইরানে বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক ও সামাজিক বিপর্যয় দেখা যাচ্ছে। ইরানের উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তম লবণাক্ত হ্রদ লেক উরমিয়া প্রায় সম্পূর্ণ শুকিয়ে গেছে। একসময় এটি পর্যটন কেন্দ্র ছিল, কিন্তু এখন এর গভীরতা মাত্র আধা মিটার। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অতিরিক্ত বাঁধ নির্মাণ এবং কৃষি কাজে মাত্রাতিরিক্ত জল ব্যবহারের কারণে হ্রদটি ফিরে আসার কোনো সুযোগ নেই এমনই এক পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। এই হ্রদ শুকিয়ে গেলে লবণাক্ত ধূলিঝড়, তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং আঞ্চলিক জলবায়ু শুষ্ক হয়ে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দেবে।
মাত্রাতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ জল উত্তোলনের কারণে ইরানের ইসফাহানের মতো প্রাচীন শহরগুলোতে ভূমি অবনমন ঘটছে। ইসফাহানের গভর্নর মেহেদি জামালিনেজাদ এই ভূমি অবনমনকে “একটি সুপ্ত আগ্নেয়গিরি” হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এর ফলে ঐতিহাসিক স্থাপনা, রাস্তাঘাট, হাসপাতাল এবং এমনকি স্কুলগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। গত এক সপ্তাহে ইসফাহানের কেন্দ্রে ৭ থেকে ১৫ মিটার গভীর গর্ত তৈরি হয়েছে।
পানির অভাবে দেশের কৃষি উৎপাদন অর্ধেকে নেমে এসেছে। দক্ষিণ ইরানের আবান্দান অঞ্চলে জল লবণাক্ত হয়ে যাওয়ায় পাম গাছের উৎপাদন অর্ধেকে নেমে এসেছে।
ইরানের সরকার এই সংকট মোকাবিলায় কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করছে, তবে সেগুলো ব্যাপক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। তেহরানের নাগরিকদের জল ব্যবহার ২৫% কমানোর জন্য অনুরোধ করা হয়েছে। শিনা আনসারি স্বীকার করেন যে কৃষিক্ষেত্রে মৌলিক নীতি পরিবর্তন করা আবশ্যক। চাল এবং তরমুজের মতো পানি-নির্ভর শস্যের পরিবর্তে কম জল ব্যবহারকারী ফসলের চাষকে উৎসাহিত করার কথা বলা হচ্ছে।
কৃষকদের জন্য কৃষি ছাড়া অন্য আয়ের উৎস খোঁজার চেষ্টা করা হচ্ছে, যেন তারা পানি-নির্ভর ফসলের উপর কম নির্ভরশীল হয়। সরকার নবায়নযোগ্য শক্তির দিকে ঝুঁকছে। বর্তমানে দেশের মোট শক্তির মাত্র ১% নবায়নযোগ্য হলেও, ২০২৮ সালের মধ্যে ১২,০০০ মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য শক্তির সক্ষমতা অর্জনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
শিনা আনসারি জোর দিয়ে বলেন, জলবায়ু সংকটকে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার বাইরে রাখা উচিত। ইরান যদিও প্যারিস চুক্তিতে স্বাক্ষর করলেও নিষেধাজ্ঞার কারণে তারা এটি অনুমোদন করেনি। এটি জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা গ্রহণের ক্ষেত্রে বড় বাধা সৃষ্টি করছে।


