ফোলকে আইসাকসন: বেশিরভাগ মহান শিল্পীর একটা মিল থাকে—শৈশব, সেই শৈশবে যা ঘটেছে, তা তাদের জীবনে গভীর প্রভাব ফেলেছে। আপনি কি আপনার নিজস্ব প্রেক্ষাপট ও শুরুটা নিয়ে কিছু বলতে পারেন?
সত্যজিৎ রায়: আমি মনে করি, আমি সত্যিকারের শিল্পী হিসেবে কাজ করতে শুরু করি ক্যালকাটা বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে আসার পর। আমি অর্থনীতিতে অনার্স করেছিলাম। তারপর দুই বছর তিন মাস শান্তিনিকেতনে কাটিয়েছি, যেটা কবি, সমাজ সংস্কারক এবং শিল্পী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিশ্ববিদ্যালয়। আমি এই সময়টাকেই আমার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গঠনমূলক সময় হিসেবে বিবেচনা করি। আমি সেখানে ছবি আঁকা শিখছিলাম, আর তখনই আমার হাতে ছিল গভীরভাবে চিন্তা করার, বই পড়ার, প্রকৃতি দেখার ও মানুষকে জানার সবচেয়ে বেশি সময়। সেই সময় থেকেই আমার সবকিছু শুরু হয়—চলচ্চিত্রে আগ্রহ ইত্যাদি। আমার শৈশবটা ছিল বেশ অদ্ভুত। যখন আমি দুই বছরের, তখনই আমার বাবা মারা যান। আমরা উত্তর কলকাতায় একটা বড় বাড়িতে থাকতাম, বাড়িতেই ছিল একটা বড় প্রিন্টিং প্রেস, ব্লক-মেকিং ইউনিট আর বই প্রকাশনার ব্যবসা, কিন্তু সবকিছু একসময় একেবারে ধ্বংস হয়ে গেল।
ফোলকে আইসাকসন: আপনি কি মনে করেন ‘চারুলতা’ (১৯৬৪)-তে এর কিছু ছায়া আছে?
সত্যজিৎ রায়: আসলে এটা তো ঠাকুরের মূল গল্পে (নষ্টনীড়, ১৯০১) আগে থেকেই ছিল। কিন্তু যেহেতু আমার জীবনের অভিজ্ঞতা এমন ছিল, তাই আমি সেসব খুব বাস্তবভাবে ফুটিয়ে তুলতে পেরেছি। আমি তখন ছয় বছরের মতো, ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় যখন আমাদের সেই বড় বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে হয়। আমার মা আর আমি তখন কার্যত অসহায় হয়ে পড়ি। আমরা তখন আমার মামার বাড়িতে আশ্রয় নিই, উনিই আমাদের থাকার জায়গা দেন।
ফোলকে আইসাকসন: আপনার পরিবার কি রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে আত্মীয় ছিল?
সত্যজিৎ রায়: আত্মীয় না, কিন্তু আমার বাবা ও ঠাকুরের মধ্যে ভালো পরিচয় ছিল। আর আমার দাদু ছিলেন তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু; তাঁদের বয়সও প্রায় একইরকম ছিল। শান্তিনিকেতনে পড়তে যাওয়ার বিষয়টা মূলত ঠাকুর নিজেই চেয়েছিলেন। আমি কিন্তু তখন খুব একটা আগ্রহী ছিলাম না—আমি শহরের মানুষ, আর শান্তিনিকেতন ছিল একেবারে গ্রামীণ জায়গা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ওখানে গিয়ে আমার দারুণ লাভ হয়েছে। যেসব শিক্ষক ছিলেন, তাঁরা কেবল চিত্রশিল্পীই নন, সত্যিকার অর্থে গভীর দৃষ্টিভঙ্গি ও উপলব্ধিসম্পন্ন মানুষ ছিলেন।
ফোলকে আইসাকসন: গত একশো বছর ধরে যে বাঙালি সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণ চলছে, সেটা নিশ্চয়ই আপনার কাছে অনেক গুরুত্বপূর্ণ?
সত্যজিৎ রায়: অবশ্যই, আমি একে খুবই গুরুত্বপূর্ণ সময় বলে মনে করি, যদিও এখনকার তরুণ প্রজন্ম অনেকেই তা বোঝে না। তবে আমি নিজেকে ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে দেখি কি না, সেটা আমি কখনও সচেতনভাবে ভেবে দেখিনি। তবে আশা করি, আমার কাজের মধ্য দিয়ে সেটার কিছুটা প্রকাশ পায়।
ফোলকে আইসাকসন: আপনার বাড়িতে কি রাজনীতি নিয়ে আলোচনা হতো?
সত্যজিৎ রায়: খুব বেশি না, অন্তত আমার মামার বাড়িতে না। তবে প্রতিদিনের পরিবেশ সংগীত ছিল । আমার ফুপি, কাকিমারা সবাই গান করতেন। কিন্তু পরিবারটি খুব একটা বুদ্ধিবৃত্তিক ছিল না, আর আমি সেখানকার পরিবেশে একজন শিল্পী হিসেবে গড়ে উঠিনি।
ফোলকে আইসাকসন: যুদ্ধের ঠিক আগ মুহূর্তে আপনি কী করছিলেন?
সত্যজিৎ রায়: আমি তখন শান্তিনিকেতনে ছিলাম। যেদিন জাপানিরা কলকাতায় বোমা ফেলল, সেদিনই আমি শান্তিনিকেতন ছেড়ে দিলাম। খবরটা রেডিওতে শুনে মনে হলো আমি যেন ঘটনাগুলোর থেকে অনেক দূরে আছি। আমার মা তখন কলকাতায় ছিলেন, তাই আমি ফিরে এলাম। আমি জানতাম, আমি ফাইন আর্ট নয়, বাণিজ্যিক শিল্পেই যাব।
ফোলকে আইসাকসন: দেশভাগ আপনার জীবনে কী প্রভাব ফেলেছিল?
সত্যজিৎ রায়: আমার নিজের জীবন তেমনভাবে প্রভাবিত হয়নি। যদিও আমার মূল বাড়ি এখনকার পূর্ব পাকিস্তানে (বাংলাদেশে) সেখানে আমার দাদু জন্মেছিলেন, আমার বাবা কিছুদিন সেখানে ছিলেন কিন্তু আমি কখনও ওখানে থাকিনি। আমি সবসময়ই নিজেকে কলকাতা আর পশ্চিমবঙ্গের মানুষ বলেই অনুভব করি। তবে সাংস্কৃতিক দিক দিয়ে পূর্ব পাকিস্তানের গান, লোককথা এসবের সঙ্গে আমি পরিচিত ছিলাম। কিন্তু আমাদের জীবনে যা সত্যিই বড় প্রভাব ফেলেছে, তা হলো শহরের পথে পথে, রেল স্টেশনে শরণার্থীদের দৃশ্য। মানুষজনের সেই ধীর-ধীরে জমে ওঠা, একের ওপর এক মানবজীবনের স্তূপ, তা সত্যিই ভয়ংকর ছিল।
ফোলকে আইসাকসন: আপনি কি আইজেনস্টাইনের ছবি দেখেছিলেন?
সত্যজিৎ রায়: হ্যাঁ, রাশিয়ান সিনেমাও কিছু দেখা যেত, কারণ তখন রাশিয়া আমাদের মিত্র ছিল। ম্যাক্সিম গোর্কি ট্রিলজি, আইজেনস্টাইনের ছবি, পুদোভকিনের কিছু কাজ এসব এসেছিল। একটা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা—১৯৪৬ বা ’৪৭ সালে পুদোভকিন আর অভিনেতা চেরকাসভ কলকাতায় এসেছিলেন। আমি এর আগেই ‘আইভান দ্য টেরিবল’ (১৯৪৪) দেখেছি, আর চেরকাসভকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম উনার চোখ এত বড় করে কীভাবে রেখেছিলেন, কারণ তাঁর চোখ তো আসলে ছোট। উনি বলেছিলেন, “আইজেনস্টাইন আমাকে এমন করতে বলেছিলেন।” উনি একটু সমালোচনামূলক সুরে বলেছিলেন, “আইজেনস্টাইন আমাকে এমন সব অস্বাভাবিক ভঙ্গিমা নিতে বলতেন, যে দিনের শেষে শরীরের সবখানে ব্যথা করত।”
ফোলকে আইসাকসন : আপু ট্রিলজিতে কি আত্মজীবনীমূলক উপাদান আছে অনেকটা?
সত্যজিৎ রায়: প্রথম আর তৃতীয় পর্বে তেমন কিছু নেই, কিন্তু দ্বিতীয় পর্বে হয়তো কিছুটা আছে। তবে এটা বুঝতে হবে এই উপাদানগুলো এসেছে মূল উপন্যাস থেকেই। যেটা ছবিতে আছে, তার বীজরূপ মূল বইতেই ছিল। তবে দ্বিতীয় পর্বে আমি কিশোর আপুর সঙ্গে তার বিধবা মায়ের সম্পর্কের জায়গায় নিজেকে অনেকটা মেলাতে পেরেছিলাম, কারণ আমিও একইরকম পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে গিয়েছি। অবশ্য আমি কোনো গ্রামে থাকতাম না, আর মায়ের কাছ থেকে দূরে গিয়ে পড়াশোনা করতে হয়নি। কিন্তু সচেতনভাবে, বা হয়তো অচেতনভাবেও আমি আমার নিজের অভিজ্ঞতাকে আপুর অভিজ্ঞতার সঙ্গে জুড়ে দিতে পেরেছিলাম। আমার মনে হয়, এর ফলে আমি চরিত্রের মনস্তাত্ত্বিক দিকটা গভীরভাবে ধরতে পেরেছিলাম, একেবারে ভেতর থেকে!


