১৪৯৮ সালের দিকে ফ্রান্সের রাজা দ্বাদশ লুইয়ের জন্য তৈরি করা হয়েছিল একটি অলঙ্কৃত প্রার্থনার বই, যার নাম ‘আওয়ারস অব লুই’। এটি কেবল একটি ধর্মীয় পাণ্ডুলিপিই না, বরং এক ধরনের চিত্রময় শিল্পকর্ম-যার প্রতিটি পাতায় ছিল সূক্ষ্ম হাতে আঁকা মিনিয়েচার ছবি। এই অনন্যসাধারণ বইটি তৈরি করেছিলেন ফরাসি রাজদরবারের খ্যাতিমান শিল্পী জ্যাঁ বোর্দিশোঁ, যিনি মধ্যযুগীয় চিত্রকলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রতিনিধি হিসেবে পরিচিত।
মধ্যযুগীয় ইউরোপে প্রার্থনার জন্য ব্যবহৃত হাতে লেখা এবং হাতে আঁকা বইগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও মূল্যবান ছিল। ‘আওয়ারস অব লুই’ তেমনই এক দৃষ্টিনন্দন নিদর্শন। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই বইটির পরিণতিও হয়েছে বহু মধ্যযুগীয় শিল্পকর্মের মতোই বিচ্ছিন্ন ও বিলুপ্তির পথে।
১৭ শতকের শেষে কিংবা ১৮ শতকের শুরুতে বইটি ইংল্যান্ডে পৌঁছায়। সেখানে এক পর্যায়ে বইটির পৃষ্ঠাগুলো আলাদা করে বিক্রি করে দেওয়া হয়, যার ফলে এর সামগ্রিক গঠন নষ্ট হয়ে যায়। বর্তমানে ‘আওয়ারস অব লুই’-এর মাত্র ১৬টি চিত্রচূড়ান্ত পৃষ্ঠা বিভিন্ন জাদুঘর ও সংগ্রহশালায় ছড়িয়ে আছে। লন্ডনের ব্রিটিশ লাইব্রেরি এবং ভিক্টোরিয়া অ্যান্ড অ্যালবার্ট মিউজিয়াম, ফ্রান্সের ল্যুভর, ফিলাডেলফিয়ার ফ্রি লাইব্রেরি ও আরও কিছু প্রতিষ্ঠানে।
২০০৩ সালে গেটি মিউজিয়াম এই হারিয়ে যাওয়া শিল্পকর্মের তিনটি মিনিয়েচার সংগ্রহ করে। এই তিনটি চিত্রের মধ্যে অন্যতম ছিল “দ্য প্রেজেন্টেশন ইন দ্য টেম্পল”, “বাথশেবা বাথিং”, এবং একটি অনির্ধারিত চিত্র যেখানে রাজা দ্বাদশ লুই চারজন সাধুর মাঝে বসে প্রার্থনায় মগ্ন। তবে তৃতীয় চিত্রটি বিশ্লেষণ করে বিশেষজ্ঞরা দেখতে পান-এটি অসম্পূর্ণ। কারণ চিত্রের চরিত্রগুলোর দৃষ্টি বাম পাশে নিবদ্ধ, যেন তারা কিছু একটা দেখছে, কিন্তু সেটি ছবিতে নেই। তখনই অনুমান করা হয়, এটির বাকি অংশ হারিয়ে গেছে।
দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর অবশেষে ২০১৮ সালে ফ্রান্সের এক ছোট্ট নিলাম ঘরে সান্দ্রা হিন্ডম্যান নামের এক শিল্প ব্যবসায়ী একটি মধ্যযুগীয় চিত্র খুঁজে পান। চিত্রটি দেখে তাঁর মনে হয় এটি সম্ভবত জ্যাঁ বোর্দিশোঁর আঁকা কাজ। তিনি যোগাযোগ করেন শিল্প ইতিহাসবিদ নিকোলাস হিন্ডম্যান-এর সঙ্গে। হিন্ডম্যান গভীরভাবে বিশ্লেষণ করে নিশ্চিত হন-এটাই সেই হারিয়ে যাওয়া পৃষ্ঠা। এরপর তিনি গেটির প্রবীণ কিউরেটর এলিজাবেথ মরিসনকে বিষয়টি জানান। চিত্রটি ছিল ‘দ্য লামেন্টেশন’-একটি আবেগময় ধর্মীয় চিত্র, যেখানে কুমারী মেরি যিশুর নিথর, রক্তাক্ত দেহকে কোলে নিয়ে শোকে স্তব্ধ। তাঁর আশেপাশে শোকাহত শিষ্যরা দাঁড়িয়ে। চিত্রটির বর্ণনা, দৃষ্টির অভিমুখ এবং রঙের ব্যবহারের সঙ্গে দ্বাদশ লুইয়ের প্রার্থনার ছবিটির মিল এতটাই প্রকট ছিল যে, স্পষ্ট হয়ে যায় এটি আসলে একটি বৃহত্তর চিত্রের অংশ।
তবে রহস্য এখানেই শেষ নয়। দুটি চিত্র পুনরায় পাশাপাশি রেখে গবেষকরা আবিষ্কার করেন, দুটোর সোনালি ফ্রেমের উপরিভাগ কাটা।ধারণা করা হয় প্রথমে ‘দ্য লামেন্টেশন’ পাতাটি হয়তো অনিচ্ছাকৃতভাবে ছোট করা হয়েছিল। পরবর্তীতে যখন বোঝা যায় এটি আসলে দ্বাদশ লুইয়ের চিত্রের সঙ্গে যুক্ত ছিল, তখন সেটির উচ্চতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে দ্বাদশ লুইয়ের চিত্রটিকেও কেটে ফেলা হয়।দুটি বিচ্ছিন্ন চিত্র অবশেষে প্রায় দুই শতাব্দী পর একত্রিত হলো। একটি হারিয়ে যাওয়া অধ্যায় যেন নতুন করে জীবিত হলো। গেটি মিউজিয়াম তাদের ” Our Voices, Our Getty: Reflecting on Manuscripts ” প্রদর্শনীতে এই দুই চিত্রকে প্রথমবারের মতো একত্রে উপস্থাপন করছে।
এই ঘটনা শুধু একটি শিল্পকর্মের পুনর্মিলন নয়, বরং একটি বিস্মৃত ইতিহাসের পুনরুদ্ধার। এটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, ইতিহাসে হারিয়ে যাওয়া অনেক কিছুই আবার ফিরে আসতে পারে, যদি অনুসন্ধান যথাযথ হয়-আর চোখে থাকে আবেগ, ভালোবাসা ও সতর্ক দৃষ্টি। ‘আওয়ারস অব লুই’ এখন আর শুধু এক বিচ্ছিন্ন পাণ্ডুলিপি নয়, বরং মধ্যযুগীয় ইউরোপীয় শিল্পচর্চার জীবন্ত দলিল।


