আওয়ামী লীগের কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা , ঝুঁকির দিকগুলো কী : ডেভিড বার্গম্যান , সাংবাদিক ও মানবাধিকারকর্মী

” … নির্বাচনকে প্রভাবিত করা, স্বাধীন চিন্তা দমন, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের রাজনৈতিকীকরণ এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড দ্রুত আওয়ামী লীগের ১৫ বছরের শাসনের বৈশিষ্ট্য হয়ে ওঠে। পূর্ববর্তী সরকারগুলোও এ ধরনের অসদাচরণের বাইরে ছিল না। তবে আওয়ামী লীগের অধীনে এর মাত্রা ও তীব্রতা ছিল অভূতপূর্ব, যা একে স্বৈরাচারী শাসন হিসেবে চিহ্নিত করার ভিত্তি তৈরি করে।…তবে ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই পর্যন্ত আওয়ামী লীগের শাসনকে বাংলাদেশের বৃহত্তর রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি চরম সংস্করণ হিসেবেই চিহ্নিত করা সম্ভব।

১৬ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত ঘটনাপ্রবাহ পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে দেয়। ছাত্রদের নেতৃত্বে সংগঠিত প্রতিবাদকে সরকার নির্মমভাবে দমন করতে থাকে।…স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন নিষ্ঠুরতা কখনোই দেখা যায়নি। এটাকে পূর্ববর্তী কোনো সরকারের বা দলের কোনো কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তুলনা করা চলে না।

… আওয়ামী লীগের এখনো উদ্ধত, সংস্কারহীন ও অনুশোচনাহীন মনোভাব। একই সঙ্গে যৌক্তিক ধারণা করা যেতে পারে–তারা দেশকে অস্থিতিশীলও করে তোলায় সচেষ্ট। এসব বিষয় দলের কার্যক্রম স্থগিত রাখার পক্ষে যুক্তিকে আরও শক্তিশালী করে তোলে।

দল নিষিদ্ধ করার পক্ষে মূল যে যুক্তিগুলো রয়েছে, তার সারাংশ হলো আওয়ামী লীগ সরাসরি হত্যাযজ্ঞে অংশ নিয়েছে এবং পরে তার কোনো জবাবদিহি করেনি; ফলে দলটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে অংশগ্রহণের অধিকার হারিয়েছে। কিন্তু এরপরও দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার বড় ধরনের কিছু ঝুঁকি রয়েছে।

প্রথমত, এটি দেশের রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকারের ওপর বড় প্রভাব ফেলবে। আওয়ামী লীগ দেশের সবচেয়ে পুরোনো রাজনৈতিক দল। এর শিকড় ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে প্রোথিত। তাদের রয়েছে এক বিশাল জনসমর্থনের ভিত্তি। তাদের অনেকেরই ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ঘটনার সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই।

নানা কারণে এই দলটিকে অনেকে সমর্থন করে। কেউ করে দলটির সামাজিক-সাংস্কৃতিক অবস্থানের কারণে, কেউ ধর্মনিরপেক্ষতার পক্ষে অবস্থানের কারণে, কেউ উন্নয়নমূলক কাজ অথবা শুধু তার ঐতিহাসিক ভূমিকার কারণে।

নতুন নিষেধাজ্ঞার ফলে এই লাখ লাখ সমর্থক বস্তুত তাদের রাজনৈতিক অধিকার হারাবে। আওয়ামী লীগের পক্ষে যেকোনো মতপ্রকাশ—মৌখিক, লিখিত বা অনলাইনে শেয়ার করাও অপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে। দলটির সমর্থকদের শান্তিপূর্ণ জমায়েত, এমনকি সামাজিক বা অনানুষ্ঠানিক বৈঠকও গ্রেপ্তারের ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

এতে ভয়ের এক পরিবেশ তৈরি হবে, যেখানে নজরদারি, হয়রানি ও ইচ্ছামতো গ্রেপ্তারের আশঙ্কা থাকবে আর মতপ্রকাশ ও সমাবেশের অধিকার সংকুচিত হবে। গণমাধ্যমের স্বাধীনতাও এতে বড় ধাক্কা খাবে। কারণ, পত্রিকা ও টিভি চ্যানেলগুলোকে আওয়ামী লীগ–সম্পর্কিত যেকোনো কিছু প্রকাশে যথেষ্ট সতর্ক থাকতে হবে।

… তার ওপর একটি প্রধান রাজনৈতিক শক্তিকে পুরোপুরি বাইরে রাখার মাধ্যমে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বিপুলসংখ্যক ভোটারকে কার্যত রাজনৈতিক প্রক্রিয়া থেকে বঞ্চিত করবে। অধিকাংশ আওয়ামী লীগ সমর্থক অন্য কোনো দলকে সমর্থন করবে—এমন সম্ভাবনা খুব কম; বরং তারা হয়তো শ্রেফ ভোট দিতেই আগ্রহ হারাবে। এর ফলে দেশের একটি বড় জনগোষ্ঠী আবারও এমন এক নির্বাচনের মুখোমুখি হবে, যেখানে তাদের সমর্থিত দল ব্যালটে অনুপস্থিত থাকবে।

… তাহলে এই লাখ লাখ মানুষ, যাঁদের এখন রাজনীতিতে অংশগ্রহণের অধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে না, তাঁরা কোথায় যাবেন? নিষেধাজ্ঞা নিয়ে এক বিশ্লেষক যেমন বলেছিলেন, ‘বাদ দেওয়া থেকে ক্ষোভ জন্মায়, তা শান্তিপূর্ণ রূপান্তরকে অকার্যকর করে তোলে এবং প্রায়ই নতুন অস্থিতিশীলতার চক্রকে উসকে দেয়।

আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা মানে একটি ইতিমধ্যেই ক্ষতবিক্ষত গণতন্ত্রকে প্রতিশোধমূলক ও একপক্ষীয় ব্যবস্থায় রূপান্তর করা, যেখানে অপরাধীরাও শহীদে পরিণত হতে পারে এবং একটি বিভক্ত সমাজ আরও গভীরভাবে মেরূকৃত হয়ে উঠতে পারে।’ এটাই এই নিষেধাজ্ঞার সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ঝুঁকি।

সমানভাবে উদ্বেগজনক হলো নিষেধাজ্ঞা ঘোষণার যে প্রক্রিয়ায় সিদ্ধান্তটি গৃহীত হয়েছে। মনে হচ্ছে সরকার উচ্চকণ্ঠ একদল বিক্ষোভকারীর চাপের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে।…অথচ এর আগের দিনই প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে বিবৃতি দিয়ে বলা হয়েছিল রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

… নৈতিক দায়বদ্ধতাই যদি একমাত্র বিবেচ্য মানদণ্ড হতো, তাহলে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের যথার্থতা নিয়ে কোনো প্রশ্নই থাকত না। কিন্তু গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা এর চেয়ে অনেক বিস্তৃত দৃষ্টিভঙ্গি দাবি করে, যেখানে রাজনৈতিক বহুত্ববাদ, রাজনৈতিক ও নাগরিক অধিকার এবং দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্থিতিশীলতার ওপর এর প্রভাবকে বিবেচনায় নিতে হয়।

এসব দিক বিচার করলে দেখা যায়, নিষেধাজ্ঞা আরোপের ঝুঁকি এর সম্ভাব্য উপকারিতার তুলনায় বেশি। কিন্তু আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়ে গেছে। এখন এর ফলাফল দেখার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। “


LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

জাতিসংঘের প্রতিবেদন – বিশ্বে প্রতি ১০ মিনিটে একজন নারী নিকটজনের হাতে খুন

বিশ্বজুড়ে নারীহত্যা বা ফেমিসাইডের ভয়াবহতা ২০২৪ সালে নতুন করে চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) এবং নারী বিষয়ক সংস্থা...

বিএনপির নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ। ...

নির্বাচনে অংশ নিতে পূর্ণ উদ্যমে প্রচারণা কৌশল সাজাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলীয় সূত্র বলছে, তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারের প্রচারণা পরিচালনা করবে...

বিশ্ব অর্থনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে কৌশল পুনর্বিবেচনা করুন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান

খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে- যেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তি ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের দিকে সরে যাচ্ছে-বাংলাদেশকে তার অবস্থান নতুন...

বাংলাদেশের রাজনীতিতে উত্তপ্ত মুহূর্ত

- মাইকেল কুগেলম্যানদৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গত বছর আন্দোলনকারীদের ওপর...

পার্ল হারবার আক্রমণ কীভাবে জাপানকে অনিবার্য ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছিল?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে জাপানের সাম্রাজ্যবাদ এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল ঐতিহাসিক অধ্যায়। ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে ১৯৪৫ সালের আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত...

খেলুন

নিউজ লেটার

বড়রা হাসুন