যুক্তরাষ্ট্রের ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে কর্মসংস্থান ফিরিয়ে আনার কথা বলে ট্যারিফ-যুদ্ধ শুরু করেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনান্ড ট্রাম্প। তার প্রধান লক্ষ্য যুক্তরাষ্ট্র থেকে যেসব কারখানা চীনে চলে গেছে সেগুলোকে আবার তার দেশে ফিরিয়ে আনা।
তিনি মনে করেন, আইফোন তৈরি করতে যেসব যন্ত্রাংশের প্রয়োজন হয় সেগুলোর কারখানা যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে ফিরিয়ে আনতে পারলেই কেবল তিনি এই বাণিজ্যযুদ্ধে সফল হয়েছেন বলে মনে করবেন। এর জন্য তিনি অ্যাপলকে তাদের উৎপাদন ব্যবস্থা যুক্তরাষ্ট্রে আনতে একাধিকবার আহ্বান জানিয়েছেন।
আইফোনের পেছনে লেখা থাকে ‘ডিজাইনড বাই অ্যাপল ইন ক্যালিফোর্নিয়া’। পরের লাইনেই থাকে ‘অ্যাসেম্বলড ইন চায়না’। শুধু আইফোনই নয়, অ্যাপলের অন্য প্রায় সব পণ্যের ক্ষেত্রেও এটা প্রযোজ্য।
গত বছর অ্যাপল বিশ্বজুড়ে প্রায় ২৩ কোটি আইফোন বিক্রি করেছে। এর মধ্যে ৯০ শতাংশই আইফোন সংযোজন হয় চীনে। এছাড়া ভারতসহ কয়েকটি জায়গায় অ্যাপলের পণ্য সংযোজন হয়।
সংযোজন বলা হয় এ কারণে যে, একটি আইফোন তৈরিতে যেসব যন্ত্রাংশ লাগে তা বিশ্বজুড়ে শত শত কোম্পানিতে তৈরি হয়। সুনির্দিষ্ট করে অ্যাপল তাদের ওয়েবসাইটে এরকম ১৪০টি কোম্পানির কথা উল্লেখ করেছে যারা ২০২১ সালে তাদেরকে যন্ত্রাংশ সরবরাহ করেছে।
এই কোম্পানিগুলোর কোনোটাই অ্যাপলের মালিকানাধীন নয়। এর মধ্যে কিছু কোম্পানি যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে থাকলেও স্বাভাবিকভাবেই বেশিরভাগ কোম্পনিই চীনভিত্তিক। অ্যাপলের চাহিদা ও ডিজাইন অনুযায়ী এসব কোম্পানি যন্ত্রাংশ তৈরি করে দেয়।
এর মধ্যে সবচেয়ে বড় হলো ফক্সকন। চীনের ঝেংজুতে এই কোম্পানির অ্যাসেম্বলি লাইনে প্রায় দুই লাখ কর্মী দিনের ২৪ ঘণ্টা সপ্তাহের সাতদিনই আইফোন সংযোজনের কাজ করেন।
সেদিক থেকে অ্যাপল মূল কাজ হয়ে যায় রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট সংক্ষেপে যাকে বলা হয় ‘আরএন্ডডি’। এরপর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে কাজটা অ্যাপল করে তা হলো — সরবরাহ শৃঙ্খল ব্যবস্থাপনা বা সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট। আর এই কাজে ‘গুরু’ হিসেবে মানা হয় অ্যাপলের বর্তমান সিইও টিম কুককে।
সান্তা ক্লারা ইউনিভার্সিটির লিভি স্কুল অব বিজনেসের অধ্যাপক অ্যান্ডি সে মনে করেন, প্রথমদিকে কোম্পানিগুলো কম মজুরির জন্য চীনে গেলেও এখন পরিস্থিতি বদলেছে। ‘বিশ্বের কারখানা’ হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করে ফেলেছে তারা।
অ্যাপলের সিইও একাধিকবার বলেছেন, আইফোন তৈরিতে যে বিপুল সংখ্যায় দক্ষ জনবল দরকার সেটা চীনের বাইরে পাওয়া কঠিন। সেই সঙ্গে যেসব অত্যাধুনিক সরঞ্জাম প্রয়োজন সেগুলোও শুধু চীনেই তৈরি হয়। এছাড়াও, ইলেকট্রনিক্স ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের জন্য চীনে শক্তিশালী এবং সমন্বিত সাপ্লাই চেইন গড়ে উঠেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধুমাত্র আইফোন তৈরির জন্য যুক্তরাষ্ট্রে নতুন কারখানা স্থাপন এবং সাপ্লাই চেইন গড়ে তুলতে বহু বছর সময় এবং বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রয়োজন হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের আইফোন তৈরির সক্ষমতা আছে বলে হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে দাবি করা হলেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চীনা পণ্যের ওপর ট্রাম্প শুল্ক আরোপ করার পরও আইফোনের মতো উচ্চ প্রযুক্তির পণ্যের উৎপাদন যুক্তরাষ্ট্রে ফিরিয়ে আনা অত্যন্ত কঠিন।
এটা করতে গেলে দাম হয়ে যাবে আকাশচুম্বী। অনুমান করা হয়, চীনে তৈরি এক হাজার ডলারের আইফোন যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি হলে দাম তিন হাজার ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। এমন মূল্যবৃদ্ধি অ্যাপলের বিক্রি এবং বাজারকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।


